আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এবং পোশাক শ্রমিক আন্দোলন

বরাবরের মতো এবারও এ শিল্পের শ্রমিক আন্দোলনের সূতিকাকার “আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল” I ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৩ সালে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন থেকে শুরু করে এ শিল্পের সকল বড় বড় দুর্ঘটনাগুলো যেমন ২০০৫ সালে স্পেকট্রা সোয়েটার কারখানা ভবন ধসে পড়া, ২০১০ সালে হামিম গ্রুপে শ্রমিক অসন্তোষ ও আগুন, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নি দুর্ঘটনা, এবং ২০১৩ সালে সবচেয়ে বিধ্বংসী রানা প্লাজা ধস সবই আশুলিয়া এবং এর আশেপাশের এলাকায় ঘটে। আশুলিয়া, সবুজে ঘেরা একটি এলাকা কিভাবে অশান্ত শিল্পাঞ্চল হয়ে উঠল সেই গল্পটা জানার আগ্রহ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে এ অঞ্চলের কর্ম পরিবেশ এবং শ্রমিক সন্তোষ নিয়ে গবেষণার সুযোগ হয়েছিল I সেই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত কিছু তথ্যই এখানে ফিরে দেখার চেষ্টা করব I

ঢাকা জেলার অধীনে সাভার উপজেলাটি দুটি থানায় বিভক্ত I একটি সাভার, অন্যটি আশুলিয়া I আশুলিয়া একটি গ্রাম, একটি ইউনিয়ন এবং একই সাথে একটি থানার নাম I আশুলিয়া থানার অধীনে রয়েছে পাঁচটি ইউনিয়ন I সেগুলো হচ্ছে: ১. আশুলিয়া, ২. ইয়রপুর, ৩. ধামসানা, ৪. পাথালিয়া এবং ৫. শিমুলিয়া।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৮০’র আওতায়, ১৯৮৮ সালে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (DEPZ) অনুমোদন পেয়েছিল । সে সময়, DEPZ এর প্রস্তাবিত স্থানে পৌঁছানোর জন্য সাভার, নবীনগর হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হতো। সেই দীর্ঘ ও জটিল যোগাযোগ এড়াতে এবং বিশেষত বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিমানবন্দর এবং ঢাকা EPZ কে সংযুক্ত করতে একটি শর্টকাট রাস্তা নির্মাণ করা হয়, যা আশুলিয়া সংযোগ রাস্তা নামে পরিচিত । কামারপাড়া থেকে DEPZ পর্যন্ত ২৩ কিমি রাস্তার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৯০ সালে এবং রাস্তাটি সম্পন্ন হয় ১৯৯৭ সালে । ১৯৯৮ সালের বন্যায় ঢাকা শহরের অধিকাংশ এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে I অনেক গার্মেন্টস কারখানা এবং শ্রমিকদের আবাসস্থল পানির নিচে চলে যায় I কিন্তু উঁচু ভূমির কারণে আশুলিয়া বন্যামুক্ত থাকে I

আশুলিয়া, EPZ এবং বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবার প্রাপ্যতা, সর্বোপরি বন্যামুক্ত স্থানটির জমির মূল্য টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় RMG উদ্যোক্তাদের সেই এলাকায় তাদের নতুন কারখানা স্থাপন এবং বিদ্যমান কারখানা গুলোর সম্প্রসারণ করতে আকৃষ্ট করেছিল।যেহেতু এলাকাটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্বাচিত হয়েছিল তাই শুরু থেকেই এটি পরিকল্পিত শিল্পনগর হিসেবে বিকাশিত হয়ে ওঠেনি I আশুলিয়া ব্রিজ এবং বাইপাল এর মধ্যে তিন কিলোমিটার দূরত্বে ৩০০টিরও বেশি কারখানার মাধ্যমে ঐ বিশেষ এলাকাটি রপ্তানিতে প্রায় ৩০% অবদান রাখে I অঞ্চলটিতে বিভিন্ন আকার ও ধরনের compliant এবং non-compliant তৈরি পোশাক কারখানা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে I গার্মেন্টস কারখানার পাশাপাশি, শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বাসস্থানের কথা চিন্তা করে অনেক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এই এলাকায় তাদের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রায় ৩০ লক্ষ শ্রমিকের বাসস্থান আশুলিয়া আজ একটি উচ্চ জন ঘনত্বের এলাকায় পরিণত হয়েছে , যা স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের জন্য একটি নিশ্চিত এবং একতরফা ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছে ।শুধু ঘর ভাড়া নয়, অতিমাত্রায় অভিবাসিত শ্রমিক নির্ভর শিল্পাঞ্চলটিতে বিদ্যুৎ এবং পানির বিলও অন্যান্য এলাকায় তুলনায় বেশি। এখানে EPZ, non–EPZ, RMG, non-RMG, compliant এবং non-compliant কারখানাগুলোর মধ্যে মজুরি এবং অন্যান্য প্রণোদনার প্যাকেজের সুবিধার ভিন্নতা রয়েছে । বিভিন্ন খাতের কারখানার শ্রমিকরা ভিন্ন ভিন্ন মজুরি কাঠামো ও সুযোগ সুবিধার আওতায় বসবাস করলেও বাসস্থানের ক্ষেত্রে সকলকেই উচ্চ হারে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়।এই অসঙ্গতিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক মজুরি কাঠামো এবং বিভিন্ন প্রণোদনার প্যাকেজ শ্রমিকদের অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কখনো কখনো সেই অসন্তুষ্টি আন্দোলনে রূপ নেয় ।মজুরি বৃদ্ধির সাথে সাথে বাসা ভাড়া বৃদ্ধির নিবিড় সম্পর্ক থাকায় আশুলিয়ার যেকোন শ্রমিক আন্দোলনে বাড়িওয়ালাদের একটি প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে । উপরন্ত, এসব বাড়িতে, মালিক কিংবা তার বখাটে ছেলেটি বিশেষত মহিলা শ্রমিকদের সাথে সব সময় সঠিক আচরণ করেন না । দ্বিতীয়ত, ঝুট বা অব্যবৃত কাপড়ের ছোট টুকরা শ্রমিক অসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ । এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত লোকেরা রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্কিত। ঝুট ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সংঘাত শেষ পর্যন্ত এই খাতে অসন্তোষ তৈরি করে। তৃতীয়ত, দ্বিতীয় পর্যায়ের পোশাক শিল্পের ক্লাস্টারটিতে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছিল না। কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (ETP), পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এবং এত বৃহৎ সংখ্যক কারখানার জন্য যথেষ্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তা ও মহাসড়ক নেই। অতিরিক্ত শিল্পায়নের ফলে এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে এবং পরিবেশের গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । চতুর্থত, অকার্যকর মানবসম্পদ বিভাগ (HRD) ।শ্রমিকরা HR অনুশীলন নিয়ে খুশি নয়, কারণ তারা দাবি করে যে কারখানায় HRD নিয়োগকর্তাদের প্রেসক্রিপশনের দ্বারা কাজ করে। শ্রমিকদের অনুভবে,, কারখানায় HRD এর ভূমিকা পুলিশ সদৃশ, যেখানে শ্রমিকদের সবসময় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে, শ্রমিকরা কারখানার প্রধানের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান না। যদিও কারখানায় অভিযোগ বক্স রয়েছে কিন্তু এই বক্সগুলি সেই ব্যক্তিদের এবং বিভাগের নিয়ন্ত্রণে যাদের সম্পর্কে শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করেন। আশুলিয়ায় অভিবাসনের হার অন্য যেকোনো ক্লাস্টারের তুলনায় সর্বোচ্চ। সাধারণত, শ্রমিকরা তাদের চাকরি পরিবর্তন করেন না বরং তারা তাদের “বস” এবং কর্মস্থল পরিবর্তন করেন।সর্বোপরি, শিল্প নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান (শ্রম আদালত, DIFE, EPB, এবং BGMEA/BKMEA) সমূহের কার্যকরী উপস্থিতির অভাব কিন্তু শ্রমিক ফেডারেশন সমূহের অতি-উপস্থিতি, বিভিন্ন সময়ে এই এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ এর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । শুধুমাত্র মজুরি বৃদ্ধির করে এই অঞ্চলের তথা এই শিল্পের সমস্যার সমাধান করা যাবে না । শ্রমিকের বর্ধিত বেতনের বড় সুবিধাভোগী শ্রমিক নয় বরং বাড়িওয়ালা এবং পাশের দোকানদার ।সমস্যাটির টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন কারখানার সমূহের স্থানান্তর এবং শ্রমিক-মালিক তথা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিকদের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ ।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দুই মাসে যতগুলো “দফা ভিত্তিক” রাজপথের আন্দোলন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তার মধ্যে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন, অন্য আন্দোলনগুলো থেকে মাত্রায়, ব্যাপকতায়, এবং আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্যে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সুদূরপ্রসারী I বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে এত বড় কর্মসংস্থানের বিকল্প কোনো সেক্টর আজ অবধি তৈরি হয়নি I বরং প্রতিষ্ঠিত এই সেক্টরটি আজ নানাবিধ ষড়যন্ত্রের শিকার I মনে রাখতে হবে প্রতিযোগী দেশগুলো কিন্তু বসে নেই I প্রয়োজনীয় এবং সময়মতো হস্তক্ষেপের অভাবে কর্মসংস্থানের একমাত্র প্রদীপটিও নিভে যেতে পারে I রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, নষ্ট করা নয় I উদ্যোক্তাদের নিরঙ্কুশ সমালোচনা নয়, বাস্তবমুখী সহযোগিতা করা I মনে রাখতে হবে সমালোচনা তারই হয়, যে কাজ করে I রবি ঠাকুর “কৃতীর প্রমাদ” কবিতায় যথার্থই বলেছেন,

টিকি মুণ্ডে চড়ি উঠি কহে ডগা নাড়ি,

‘হাত পা প্রত্যেক কাজে ভুল করে ভারি।’

হাত পা কহিল হাসি, ‘হে অভ্রান্ত চুল,

কাজ করি আমরা যে, তাই করি ভুল।’

#Ashulia#rmgbangladesh#RMGIndustry#RMGSector#labourunrest#labourchallenge#studentmovement#InterimGovernment#unemployment