দেশের ইতিহাসে “মানবসৃষ্ট” নজিরবিহীন শিল্প দুর্ঘটনা

গত ২৪শে এপ্রিল ছিল রানা প্লাজা ট্রাজেডির ১০ বৎসর। ২০১৩ সনের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের তৈরি পোষাক তথা সামগ্রিকভাবে দেশের ইতিহাসে “মানবসৃষ্ট” নজিরবিহীন শিল্প দুর্ঘটনা। এই দীর্ঘ ১০ বৎসরেও এতবড় একটি মানবিক বিপর্যয়ের কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচার কার্যটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আরো অনেক অগ্নিকান্ড এবং এর থেকে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় সারাবিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। চট্টগ্রামের কন্টেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড এবং অতি সম্প্রতি বঙ্গবাজারসহ বিভিন্ন মার্কেটে অগ্নি দুর্ঘটনা বাংলাদেশে অগ্নি নিরাপত্তার সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের নানা অসংগতি চোখে পড়ার মতো। ২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডের সময় আমি চায়নাতে একটি কারখানা পরিদর্শনরত ছিলাম। কথোপকথনের এক পর্যায়ে কারখানা প্রধান আমার কাছে জানতে চাইলেন কিভাবে এবং কখন এই দুর্ঘটনার কারণ জানা যাবে এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কি শাস্তি হবে? আমি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম তোমার দেশের এ রকম দুর্ঘটনা হলে তোমরা কি করতে? উত্তরে সে জানালো অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে এলাকার যিনি অগ্নি নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন ঘটনার গভীরতা বিবেচনায় তার শাস্তি হতো যেমন চাকরি চলে যাওয়া, জেল জরিমানা। কারণ তিনি দায়িত্বে অবহেলা করেছেন বলেই তার আওতাধীন এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
অগ্নি নিরাপত্তার মতো বিষয়টি শুধুমাত্র নোটিশ প্রদান করেই দায় এড়ানো যায় না। আইনের যথাযথ প্রয়োগের সাথে সাথে দায়িত্বও নিতে হবে। ২০১৩ রানা প্লাজা ট্রাজেডির বৎসরে বাংলাদেশের তৈরি পোষাক শিল্পের বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা নিয়ে আমার একটি লেখনি “কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে” প্রকাশিত হয়েছিল। লেখনিটির প্রাসঙ্গিকতা অনেকাংশে এখনো বিদ্যমান বিবেচনায় রানা প্লাজা ট্রাজেডির ১০ বৎসর পূর্তিতে পূণঃপ্রকাশ করা হলো।
********************************************************
‘কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষ…….
বাংলাদেশে ভবন ধ্বসে কিংবা অগ্নি-দুর্ঘটনায় “আশরাফুল মাখ্লুকাতের” অকাল মৃত্যু নতুন কিংবা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং নিয়মিত বিরতি দিয়ে সর্বমহলের অবহেলায় মধ্য দিয়ে অবেলায় প্রাণ হারাচ্ছে কখনো সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের ছাত্র, কখনো সর্বহারা শ্রমিক কখনো বা অতি সাধারণ মানুষ। দিন যায়, মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। আজকাল দুর্ঘটনা যেন কোনো ঘটনা নয়। হেলা-ফেলা, গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের করার ক্ষমতা সীমিত তারা সীমাহীন “টক শো” আলোচনায় ব্যস্ত, অন্যদিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ যেন “দেখি না কি হয়” দর্শনে আশ্রিত। বাঙ্গালীদের ভুলে যাওয়া গুণ এবং সর্বাংসহা প্রবৃত্তি এদেশের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় সুবিধা দিয়ে রেখেছে।
১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের টিভি রুমের ছাদ ধ্বসে ছাত্র অতিথি, কর্মচারী মিলিয়ে ৩৯ জনের মৃত্যু, ৩০০ জনের আহত হওয়ার ঘটনা কিংবা ২০১০ সালের ৩ জুন তারই খুব কাছে নীমতলীতে ১২৩টি মানব দেহের (যাদের অধিকাংশই মহিলা ও শিশু) অঙ্গার হওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নন-কমপ্লায়েন্স এর অংশ হলেও আন্তর্জাতিক ব্যবসার সরবরাহ চেইনের নিরীক্ষায় অতটা প্রাসঙ্গিক ছিল না। কিন্তু যে শিল্প আন্তর্জাতিক চাহিদা, শর্ত ও আচরণবিধির সাথে সম্পর্কিত, সেই শিল্পের নন-কমপ্লায়েন্স দেশে কতটা নাড়া দেয় সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আন্তর্জাতিক বিরাগে ব্যবসার ক্ষতি ও হুমকির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর সেই শিল্প যদি হয় দেশের সর্ববৃহৎ শিল্প, অর্থনীতির চালিকা শক্তি, নারীর ক্ষমতায়নের প্রধানতম প্লাটফর্ম, তখন আতঙ্ক উৎকন্ঠার কারণও থাকে যথেষ্ট। আন্তর্জাতিক ব্যবসা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই করতে হয়। উৎপাদিত পণ্যের মানের সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রের মান এবং উৎপাদনের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য স্বীকৃত এবং পূর্ব নির্ধারিত মান বজায় রাখাটা এ ব্যবসার পূর্ব শর্ত। এর ব্যত্যয় মানে শর্তের লঙ্ঘন, নিজের সাথে প্রতারণা। ব্যক্তি বিশেষের কর্মফল সমগ্র শিল্পের জন্য ঝুঁকি, দেশের জন্য অমর্যাদাকর, আর প্রতিযোগীদের জন্য সুবিধার। তাই জগন্নাথ হল কিংবা নীমতলীর দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনার সাথে রপ্তানীমুখী তৈরি পোষাক কারখানায় দুর্ঘটনার ব্যপ্তিতে, প্রচারণায় দায়বদ্ধতায় এবং পরিণতিতে ভিন্নতা রয়েছে।
বাংলাদেশে রপ্তানীমুখী তৈরি পোষাক শিল্পে ভবন ধ্বসে প্রথম বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে ১১ এপ্রিল, ২০০৫ সালে। স্কেকট্রাম সোয়েটার ফ্যাক্টরীর ঐ দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে ৬৪ জন শ্রমিকের, আহত হন ৭৪ জন। দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় আজকের রানা প্লাজার সাথে স্পেকট্রামের বিশাল অমিল থাকলেও অনেক মিলও রয়েছে। ভবন নির্মাণ আইন থেকে শ্রম আইন সব কিছুই ছিল নিয়মের উল্টো পিঠে। তখনও দেয়ালের ফাটল শ্রমিকের নজরে এসেছিল। ঘটনার ৫ দিন আগেই মালিকগণ কে জানানো হয়েছিল। উত্তরে চুপচাপ কাজ করার নির্দেশ এসেছিল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। ডোবা ভরাট করে বিল্ডিং তৈরি, ভারী যন্ত্রপাতি ৪র্থ ও ৭ম তলায় স্থাপন, ৪র্থ তলার কাঠামো ৯তলা পর্যন্ত নির্মাণ, অন্যদিকে শ্রম আইনের চুড়ান্ত লংঘন ছিল সুস্পষ্ট। ন্যুনতম মজুরি, সাপ্তাহিক ছুৃটি, কর্মস্থলে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধান বিষয়ে কিছুই করা হয়নি। শিশু ও কিশোর শ্রমিক নিয়োগ, সারারাত ধরে কাজ-এ সবই ছিল নিয়মের অংশ।
সৌভাগ্যবশত স্পেকট্রামের দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল রাত ১.০০টার দিকে। না হলে ২০১৩ রানা প্লাজার দূর্ঘটনার ব্যাপ্তি জাতিকে বরণ করতে হতো ২০০৫ সালেই। অথচ Compliance এর তথাকথিত Audit Pass করেই সেখানেই ইউরোপের বিভিন্ন নামিদামী ব্রান্ডের কাজ চলতো।
২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী। KTS Textiles Industries বৈদ্যুতিক র্শট সার্কিট থেকে উদ্ভুত আগুনের শিখায় প্রাণ হারান ৬১ জন শ্রমজীবী মানুষ। সেখানে ১২ বৎসরের শিশু থেকে ১৪ বৎসরের কিশোর শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হতো। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিতির জন্য কোন প্রকার কার্যকর ব্যবস্থাপনা বা অগ্নি মহড়ার মতো কোনো প্রচলন ছিলো না। বরং বাহির হওয়ার সমস্ত পথ তালাবদ্ধ অবস্থায় রেখে প্রতিষ্ঠানটির মালামালের তথাকথিত নিরাপত্তা বিধান করা হতো।
ঠিক তার দুদিন পর ২৫শে ফেব্রুয়ারী ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন শিল্পাঞ্চল বলে খ্যাত তেজগাঁও এ ৫ম তলা বিশিষ্ট Phoenix ভবনটি ধ্বসে পড়ে ২২ জনের মৃত্যু ঘটে এবং ৫০ জনের মতো শ্রমিক আহত হন। সেখানে তখন অননুমোদিত সংস্কারের মাধ্যমে উপরের অংশকে একটি বেসরকারী হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ চলছিল। ধ্বসে যাওয়ার সময় সেখানে Phoenix র্গামেন্টসের একটি লাইনের (কাপড় কাটা থেকে সেলাই পর্যর্ন্ত বিভিন্ন ধারাবাহিক প্রক্রিয়া) কাজ চলছিল।
সেই দিনই ইমাম-গ্রুপের একটি ভবন, যেখানে ৫টি গার্মেন্টস কারখানার অবস্থান ছিল-বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণে ৫৭ জন শ্রমিক গুরুতরভাবে আহত হন। বাহির হওয়ার পথ অত্যন্ত সরু ও মালামালের প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রচুর সংখ্যক লোক এক সাথে নীচে নেমে আসতে পারেনি।
এ দুটো ঘটনার ৯ দিন পরে ৬ মার্চ ২০০৬ বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সুত্রপাতে ৩ জনের প্রাণহানি ও ৫০ জন শ্রমিকের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। যেখানে সায়হাম ফ্যাশনস ছাড়াও আরো দুটো গার্মেন্টস কারখানা ছিল । অথচ তিনটি কারখানার শ্রমিকদের বের হবার সিঁড়িটি ছিল তৈরি পোষাকের কার্টনে অবরুদ্ধ।
২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর। রাজধানীর সন্নিকটে আশুলিয়ার হামীম গ্রুপের একটি পোষাক কারখানায় আগুনের ঘটনায় প্রায় ২২ জন নিহত এবং ৪০০ শতাধিক আহত হন। একটি গুজবের উপরের ভিত্তি করে শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ নাশকতা থেকে এই আগুনের সুত্রপাত ঘটে। পরবর্তিতে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য কারখানাগুলোতে বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়ে। অনাকাংখিত এই ঘটনায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোকে লে-অফ করে দিতে।
২০১২ সালের ২৪শে নভেম্বর তারিখটিকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ইতিহাসে কালোদিন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ভয়াবহতার দিক থেকে অতীতের সব দুর্ঘটনার রের্কড ভঙ্গ করা অগ্নিকান্ডটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনার বিষয় হয়ে দাড়ায়, যা এই শিল্পকে আগে কখনো মোকাবেলা করতে হয়নি। ১১২ জন শ্রমিকের মৃত্যু, ২০০ জনের মতো শ্রমিকের গুরুতর আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাজরিন ফ্যাশনস হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণ-মাধ্যমের শিরোনাম। তাজরিনের ঘটনাটি তখনই ঘটে যখন বাংলাদেশের তৈরি পোষাকের ভবিষ্যৎ বিষয়ে দুনিয়া জুড়ে নতুন নতুন সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছিল। বৈদ্যুতিক শর্ট র্সাকিট থেকে যে আগুনের সুত্রপাত- তার লেলিহান শিখা ১৭ ঘন্টায় সব ছাই করে দেয়। আরেকবার প্রমাণিত হয় সরকারী তদারকি আর কমপ্লায়েন্স এর নামে ক্রেতাদের নিজস্ব ও তৃতীয় পক্ষের সব নিরীক্ষার অসারতার কথা। এখানেও অব্যবস্থাপনা আর অপর্যাপ্ততার সেই একই উপাদানসমুহ বিদ্যমান। ৯ম তলা ভবনে ১৬৩০ জন শ্রমিকের/কর্মচারীর জন্য জরুরী বিকল্প সিড়ি না থাকা, সিঁড়িতে প্রতিবন্ধকতা থাকা, নিরাপত্তার নামে তালাবদ্ধ করে রাখা – সেই একই বিষয় গুলোর পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই তাজরিনের ঘটনায়ও।
তাজরিন ফ্যাশনের দু’মাসের মধ্যেই ২৭ জানুয়ারী ২০১৩ Smart Export Garments Ltd. নামে ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত আরেকটি কারখানায় আগুন লেগে ৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। আশ্চর্যের বিষয় গার্মেন্টসটি নাকি এ শিল্পের কর্তা প্রতিষ্ঠান BGMEA এর সদস্যই নয়। অথচ ইউরোপের বিখ্যাত ক্রেতা-যাদের কমপ্লায়েন্স এর ইস্যুতে শূন্য ছাড়, তাদেরই পোষাক তৈরি হচ্ছিল এই প্রতিষ্ঠানে। এ ক্ষেত্রেও অগ্নি-নির্বাপক দল কারখানাটিতে তালাবদ্ধ শ্রমিকদের জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
রানা প্লাজা-২৪ এপ্রিল ২০১৩। শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর শিল্পের ইতিহাসে এমন বিপর্যয় আগে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, পোপ ফ্রান্সিস থেকে শুরু করে ILO প্রধান গেই রাইডারসহ সবার দৃষ্টি ছিল সাভার ট্রাজেডির দিকে। মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা কত, জীবিত উদ্ধারই বা কত, তা দিয়ে শিল্পের ক্ষতি নির্ণয় করা যাবে না। বাংলাদেশের র্গামেন্টেসের শ্রমিকদের সম্পর্কে পোপ ফ্রান্সিসের ‘দাস তুল্য’ মন্তব্যও হয়ত এক সময়ে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু শাহিনাদের ক্ষোভ আর অভিমান মিলাবে কে? ” আমাকে বাচাঁও-তাড়াতাড়ি মুক্ত করো। না পারলে আমার মেয়েটিকে মানুষ করো। আমার মত গার্মেন্টসে পাঠাইও না। “গার্মেন্টস এ যে “মানুষ” থাকে না”- শাহিনা মরে গিয়ে প্রমাণ দিয়ে গেল-“ভিক্ষা করে খাবো তবু, র্গামেন্টসে কাজ করবো না।” “না খেয়ে থাকবো তবু গার্মেন্টস কাজ করবো না।” “জীবনে কেউ যেন গার্মেন্টসে চাকুরী না করে।” “মাগো তুমি কেন ঢাকায় চাকুরী করতে গেলা।” সুমী , শিউলি, পারভিন, শাহীনা ও ময়নাদের এই মন্তব্য অথবা এক এতিম সন্তানের আক্ষেপ আমাদের শিল্প মালিকেরা কি এবার শুনতে পাবে?
টেলিভিশনে পর্দার স্পষ্ট ছিল শিশু শ্রমিকের মলিন চেহারা, সন্তান প্রসব করার ঘটনা, ভারী যন্ত্রপাতি উপরের তালায় স্থাপন, এসব কিছুর পরেও কমপ্লায়েন্স এর কঠিন বেড়াজাল ডিঙিয়ে নাম করা সব ব্রান্ডের পোষাক উৎপাদন- Compliance Audit এর অসারতাকেই প্রমাণ করে। Document র্সবস্ব Compliance Audit, দুর্নীতি নির্ভর সরকারী নজরদারী, মালিকদের অব্যাহত অবহেলায় আর যাই হোক শ্রমিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়। মানবিক বিপর্যয় না শ্রমিক বিপর্যয়, দুর্ঘটনা না হত্যাকান্ড , শ্রমিক না দাস এ সব বিষয়ের চেয়ে শিল্প সর্ম্পকে শ্রমিকদের নিজস্ব যে অনুভুতি, অভিব্যক্তি এবং অভিমান তার খন্ডণ করবে কে এবং কিভাবে?
শ্রমিক সংকটে কাতর যে শিল্প, সেখান থেকে যদি শ্রমিকেরা মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্য কোন শিল্পে আপনি বিনিয়োগ করে আপনার লভ্যাংশ নিশ্চিত করবেন? দেশীয় প্রাচুর্য অতৃপ্ত মালিকগণ বিদেশী প্রাচুর্যে ডুবে না থেকে আপনার প্রাচুর্যের উৎসভূমি যে শ্রমিক তাদের মনের কথাটি পড়ার চেষ্টা করুন। অন্যথায় তাদের দীর্ঘশ্বাসের উত্তাপ আখেরাতে কেন দুনিয়াতেও লেগে যেতে পারে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, মালিক এবং তাদের সহযোগিদের সীমাহীন ঔদাসীন্য, স্বার্থপরতা এবং লোভের কারণে যে দুর্ঘটনা বলা চলে? না কি হত্যাও বলা যায়। আর কতজন মরলে তাকে গণহত্যা বলা যায়-সে প্রশ্নটির কোন মিমাংসা হবে কি? নাকি কবীর সুমনের মত শুধু অপেক্ষাতেই থাকতে হবে।
‘কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে
বড্ড বেশী মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।’
মোহাম্মদ হাসান
নভেম্বর ২০১৩